১৬ ডিসেম্বর—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়; এটি বাঙালির হাজার বছরের লাঞ্ছনা, শোষণ ও সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয়ের প্রতীক। ১৯৭১ সালের এই দিনে লাখো শহীদের রক্ত আর অসংখ্য মা-বোনের ত্যাগের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র—বাংলাদেশ।

এই বিজয়ের পথ সহজ ছিল না। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি আন্দোলনই স্বাধীনতার পথে বাঙালিকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ডাক দিয়েছিলেন, তা-ই রূপ নিয়েছিল সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধে।

বিজয় দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা কখনো দান নয়, এটি অর্জন করতে হয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিয়ে যাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন, যাঁরা শহীদ হয়েছেন, যাঁরা নির্যাতিত হয়েছেন—তাঁদের আত্মত্যাগেই আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। এই বিজয় কেবল সামরিক পরাজয়ের নয়; এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের, শোষণের বিরুদ্ধে মানবতার বিজয়।

আজ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরে দাঁড়িয়ে বিজয় দিবস আমাদের কাছে নতুন করে দায়িত্বের প্রশ্ন তোলে। আমরা কি সেই চেতনাকে ধারণ করছি? সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার—যার জন্য মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল—সেগুলো বাস্তবায়নে আমরা কতটা সফল? বিজয় দিবস কেবল অতীত স্মরণের দিন নয়, এটি ভবিষ্যতের প্রতি অঙ্গীকারেরও দিন।

নতুন প্রজন্মের কাছে বিজয় দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। ইতিহাস জানার মধ্য দিয়েই তারা বুঝতে পারবে—এই পতাকা, এই মানচিত্র কত ত্যাগের ফসল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেই একটি দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য।

বিজয় দিবসে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সকল শহীদকে। তাঁদের রক্তের ঋণ কখনো শোধ হবার নয়, তবে দেশপ্রেম, সততা ও মানবিক মূল্যবোধে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হতে পারে তাঁদের প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা।

মহান বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।

2 thoughts on “বিজয় দিবস: আত্মত্যাগ থেকে আত্মপরিচয়ের অমর ইতিহাস”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *