আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। এক দেশের পণ্য, সেবা ও পুঁজির সঙ্গে অন্য দেশের সংযোগ কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, বরং কূটনৈতিক সম্পর্ক, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক বাণিজ্যের মোট পরিমাণ ২০২৩ সালে প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূরাজনৈতিক সংঘাত, আঞ্চলিক টানাপোড়েন এবং সুরক্ষাবাদী নীতির কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এক অনিশ্চিত ও সংকটপূর্ণ সময় পার করছে।
তুলনামূলক সুবিধা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভিত্তি
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল দর্শন হলো তুলনামূলক সুবিধা। প্রতিটি দেশ তার প্রাকৃতিক সম্পদ, শ্রমশক্তি, প্রযুক্তি ও ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে কিছু পণ্য বা সেবায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করে। এই দক্ষতার আদান–প্রদানের মাধ্যমেই বিশ্ব অর্থনীতি গতিশীল থাকে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় অর্থনৈতিক যুক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও বাণিজ্যের গতিপথ নির্ধারণ করছে।
ভারত–বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্পর্ক: পারস্পরিক নির্ভরতা ও বর্তমান টানাপোড়েন
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য কাঠামো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বাণিজ্যের পরিমাণ ১৫–১৬ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি বড় রপ্তানি বাজার, অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশের কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য ও শিল্প উপকরণের প্রধান সরবরাহকারী।
তবে এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো বাণিজ্য ঘাটতি ও অশুল্ক বাধা। সীমান্ত অবকাঠামোর দুর্বলতা, শুল্ক–বহির্ভূত নিয়ম, ট্রানজিট ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা বাণিজ্য প্রবাহকে মাঝে মাঝে ব্যাহত করছে। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক টানাপোড়েন ও কূটনৈতিক উত্তেজনা ব্যবসায়ী মহলে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উভয় দেশের অর্থনীতির জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।
ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ: বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ধাক্কা
২০২২ সালে শুরু হওয়া ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একটি বড় মোড় এনে দেয়। এই দুই দেশ বৈশ্বিক গম রপ্তানির প্রায় ২৫–৩০ শতাংশ সরবরাহ করত। যুদ্ধের ফলে খাদ্যশস্য, জ্বালানি ও সার সরবরাহে সংকট তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি তীব্র আকার ধারণ করে।
বাংলাদেশ, ভারতসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশ গম, ভোজ্যতেল ও জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়ে। পাশাপাশি জাহাজভাড়া, বীমা খরচ এবং ডলার সংকট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে আধুনিক বিশ্বে একটি আঞ্চলিক সংঘাতও কীভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি ও সুরক্ষাবাদী প্রবণতা
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম ভোক্তা বাজার হওয়ায় তাদের শুল্ক ও বাণিজ্য নীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি বা পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে এশিয়ার রপ্তানিনির্ভর দেশগুলো চাপের মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যার অন্যতম প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র। শুল্ক বৃদ্ধি বা বাণিজ্য সুবিধা হ্রাস পেলে এই খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। একইভাবে ভারতও স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম ও প্রকৌশল পণ্যে শুল্কনীতির নেতিবাচক প্রভাব অনুভব করছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য মূল চ্যালেঞ্জ
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো—
- ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও যুদ্ধজনিত অনিশ্চয়তা
- সুরক্ষাবাদী শুল্ক ও বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা
- একক বা সীমিত পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
- বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা
এই চ্যালেঞ্জগুলো উন্নয়নশীল অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও নীতিগত করণীয়
বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, এই সংকটের মধ্যেও সুযোগ রয়েছে। রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, আঞ্চলিক বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদার, প্রযুক্তিনির্ভর ও উচ্চ মূল্য সংযোজন শিল্পে বিনিয়োগ এবং বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় সক্রিয় অংশগ্রহণ—এই কৌশলগুলো দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে পারে।
উপসংহার
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এখন আর কেবল অর্থনৈতিক হিসাব–নিকাশের বিষয় নয়; এটি রাজনীতি, কূটনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি—একত্রে বিশ্ব বাণিজ্যকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রয়োজন গবেষণাভিত্তিক নীতি, কৌশলগত কূটনীতি এবং টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাণিজ্য কাঠামো গড়ে তোলা।