বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে জুলাই আন্দোলন ছিল এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে ছাত্র, তরুণ ও নাগরিক সমাজ একত্রিত হয়ে স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল সরকারের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। সেই আন্দোলনের অন্যতম সাহসী কণ্ঠস্বর ছিলেন শরীফ ওসমান হাদী, যিনি কেবল রাজনৈতিক কর্মী নন, বরং পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।

ওসমান হাদী ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং সংগঠক। তিনি তরুণ সমাজকে সংগঠিত করতেন, রাজপথে গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার পক্ষে কথা বলতেন। তার বক্তৃতা এবং কর্মযজ্ঞে ছিল সাহস, আপসহীনতা এবং স্বচ্ছতার দাবি। এই কারণে তিনি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন, আবার ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক শক্তির চোখে পরিণত হন ‘বিপজ্জনক’ কণ্ঠে।

জুলাই আন্দোলনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় হাদী ঘোষণা দেন, তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবেন। কিন্তু রাজনৈতিক দৃশ্যপটের এই প্রকাশ্য দৃঢ়তায় শুরু হয় হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন। তিনি স্বীকার করেন যে, বিদেশে অবস্থানরত সাবেক আওয়ামী লীগ সমর্থকরা তাকে এবং তার পরিবারের প্রতি হত্যার হুমকি দিয়েছেন। তবু তিনি পিছু হটেননি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন—“ভয় দেখিয়ে রাজনীতি থামানো যায় না।”

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের একদিন ঢাকার কেন্দ্রস্থলে প্রকাশ্য দিবালোকে ওসমান হাদীকে গুলি করা হয়। হাসপাতালে নেওয়া হলেও কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু শুধু একজন ব্যক্তির নয়, বরং একটি রাজনৈতিক সম্ভাবনারও শেষের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। হাদীর হত্যাকাণ্ড জাতিকে মনে করিয়ে দেয় যে, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং মত প্রকাশের শৃঙ্খল এখনও বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরাজ করছে।

ওসমান হাদীর মৃত্যুর পর দেশজুড়ে শুরু হয় তীব্র প্রতিবাদ এবং গণআন্দোলন। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরাঞ্চলে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে নিহত নেতার জন্য ন্যায়বিচারের দাবি জানায়। কিন্তু সেই ক্ষোভের একপর্যায়ে তা সহিংসতায় রূপ নেয়। প্রতিবাদের ধারা প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার–এর কার্যালয়ে হামলায় রূপ নেয়। অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়, গণআন্দোলন এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা—দুটোই সমানভাবে বিপজ্জনক পরিস্থিতির শিকার হতে পারে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব এই সময়ে স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল—নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত দ্রুত শুরু করা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পরিবেশ রাখা। কিন্তু চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা ও হুমকির ছায়া দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করেছে।

ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে গেছে:

রাজনৈতিক মতভিন্নতা কি এখনো প্রাণঘাতী?

নির্বাচনী রাজনীতি কি সহিংসতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারছে না?

মত প্রকাশের স্বাধীনতা আজও নিরাপদ নয় কি?

হাদীর মৃত্যুর শোক এবং দেশের হতাশা সত্ত্বেও তার জীবনের বার্তা এখনও জীবন্ত। তিনি দেখিয়েছিলেন, ভয় দেখিয়ে মানুষকে চুপ করানো যায়, ইতিহাসকে নয়। তার কণ্ঠস্বর আজও রাজপথে প্রতিধ্বনিত। তাকে স্মরণ করার একমাত্র উপায় হলো—হত্যার বিচার নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করা।

জুলাই আন্দোলনের আদর্শ এবং ওসমান হাদীর সাহস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক সাহসিকতা অপরিহার্য। দেশের নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব হলো, এই মূল্যবোধ ধরে রাখা, ভয়কে জয় করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।

One thought on “ওসমান হাদী: জুলাই আন্দোলনের কণ্ঠস্বর ও হত্যাকাণ্ডের ছায়া”

Comments are closed.