কিছু মৃত্যু কেবল একটি প্রাণের অবসান নয়—তা একটি জাতির বিবেককে নাড়া দেয়। হাদির মৃত্যু তেমনই একটি নাম। এই মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের সময়ের গভীর অসুখের প্রতীক। যে সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা অপরাধ হয়ে ওঠে, সেখানে এমন মৃত্যু অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।

ইতিহাস বলে, বিপ্লব জন্ম নেয় নীরবতার কবর ভেঙে। ফরাসি বিপ্লব, ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব কিংবা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল অবিচার, বঞ্চনা আর মানুষের মর্যাদা হরণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। হাদির মৃত্যু সেই একই প্রশ্ন আবার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে—আমরা কি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে পারছি?

ইসলামের শিক্ষা এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন—
“জালিম শাসকের সামনে সত্য কথা বলাই সর্বোত্তম জিহাদ।” (তিরমিজি)

হাদি যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে থাকেন, যদি তিনি সত্য উচ্চারণ করে থাকেন—তাহলে তাঁর মৃত্যু আমাদের জন্য কেবল শোক নয়, বরং দায়িত্ব। কারণ আরেক হাদিসে বলা হয়েছে—

“তোমরা জুলুমকে জুলুম হিসেবে দেখলে তা হাত দিয়ে প্রতিরোধ করো, না পারলে মুখ দিয়ে বলো, তাও না পারলে অন্তরে ঘৃণা করো—এটাই ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (সহিহ মুসলিম)

হাদির মৃত্যু আমাদের জিজ্ঞেস করে—আমরা কোন স্তরে দাঁড়িয়ে আছি?

বাংলাদেশের ইতিহাস রক্ত দিয়ে লেখা। ভাষা আন্দোলনের শহীদ, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ—সবই প্রমাণ করে, ন্যায়ের প্রশ্নে এই জাতি কখনো চিরদিন চুপ থাকেনি। কিন্তু ইতিহাস আরও একটি কঠিন সত্য শেখায়—স্বাধীনতার পরও যদি বিচারহীনতা থাকে, যদি হত্যার পর সত্য চাপা পড়ে যায়, তবে শান্তি একটি ভঙ্গুর শব্দে পরিণত হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পর নেলসন ম্যান্ডেলা প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। তিনি সত্য ও জবাবদিহির পথ খুলে দিয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন—ন্যায় ছাড়া শান্তি আসে না, আর বিচার ছাড়া রাষ্ট্র টেকে না।

আজ হাদির মৃত্যু আমাদের সামনে সেই একই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। আমরা কি এই হত্যাকে আরেকটি সংখ্যায় পরিণত করব? নাকি এর সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের জবাবদিহি এবং বিচার নিশ্চিত করব?

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখানেই নির্ধারিত হবে। তরুণ প্রজন্ম আজ দেখছে—সত্য বলা কতটা বিপজ্জনক, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। যদি তারা দেখে যে হাদির মতো মৃত্যু ভুলে যাওয়া যায়, বিচারহীনতা স্বাভাবিক—তাহলে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক ভেঙে পড়বে।

বিপ্লব মানে অগ্নিসংযোগ নয়। বিপ্লব মানে হত্যা নয়। বিপ্লব মানে নৈতিক সাহস—যেখানে রাষ্ট্র নিজেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। হাদির রক্ত আমাদের সেই সাহসের দাবি করছে।

আজ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—
আমরা কি মৃত্যুকে রাজনৈতিক শব্দে ঢেকে ফেলব,
নাকি ন্যায়কে রাষ্ট্রের ভাষা বানাব?

হাদির মৃত্যু যদি আমাদের বিবেক জাগায়, যদি বিচার নিশ্চিত হয়, যদি সত্য উচ্চারণের পথ নিরাপদ হয়—তবেই এই রক্ত বৃথা যাবে না। নইলে ইতিহাস আবার লিখবে—আমরা দেখেও নীরব ছিলাম।

ন্যায় প্রতিষ্ঠাই শান্তির একমাত্র পথ।
আর ন্যায় ছাড়া কোনো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *