সভ্যতার ইতিহাসে ধর্ম এসেছে মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে, বিভাজন তৈরি করতে নয়। ইসলামও তার ব্যতিক্রম নয়। বরং ইসলাম এমন এক ধর্ম, যা ন্যায়, দয়া, সহনশীলতা ও মানবিক আচরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে—ধর্ম, বর্ণ কিংবা জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে।
পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে,
“আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ ও ন্যায়বিচার করতে, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের দেশ থেকে বের করে দেয়নি।” (সূরা মুমতাহিনা: ৮)
এই আয়াতই প্রমাণ করে—অমুসলিমদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা ইসলামি নির্দেশনার অংশ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবনে অমুসলিম প্রতিবেশী, ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত ও মানবিক আচরণের বহু দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। মদিনা সনদ ছিল বহুধর্মীয় সহাবস্থানের এক ঐতিহাসিক দলিল, যেখানে মুসলিম ও অমুসলিম সবাই সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করতেন।
ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, অমুসলিমদের উপাসনালয়, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও নিরপরাধ নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও ধর্মযাজকদের ওপর আঘাত নিষিদ্ধ ছিল। এই শিক্ষা আমাদের বলে—অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি অবিচার ইসলাম সমর্থন করে না, বরং কঠোরভাবে নিন্দা করে।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বর্তমান সময়ে আমরা এমন কিছু ঘটনার সাক্ষী হচ্ছি, যেখানে অমুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ হামলা, ভীতি ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। মন্দিরে হামলা, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আগুন, ধর্মীয় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে নিপীড়ন—এসব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এগুলো শুধু মানবাধিকারের লঙ্ঘন নয়, বরং ইসলামের মৌলিক শিক্ষারও পরিপন্থী।
এ ধরনের সহিংসতা সমাজে বিভক্তি বাড়ায়, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—কিছু মানুষ ধর্মের নাম ব্যবহার করে এই অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। অথচ ইসলাম স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে, জুলুম যেই করুক, সে জালেম—সে মুসলিম হলেও।
একজন অমুসলিম নাগরিক যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগ করেন, তবে সেটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; সেটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত ব্যর্থতা। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়—এটি একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।
আজ আমাদের প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। প্রশ্ন করা দরকার—আমরা কি সত্যিই ইসলামের শিক্ষা অনুসরণ করছি, নাকি আবেগ, গুজব ও রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে নিজেদের বিবেককে সমর্পণ করেছি? যারা অমুসলিমদের ওপর হামলা চালায়, তারা কেবল নিরপরাধ মানুষকেই আঘাত করে না; তারা ধর্মের নামকে কলঙ্কিত করে।
সমাধান আসবে তখনই, যখন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা ও রাষ্ট্র—সবাই একযোগে সহনশীলতার শিক্ষা দেবে। মসজিদের মিম্বর থেকে স্পষ্ট ভাষায় বলতে হবে—অমুসলিমদের ওপর হামলা হারাম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর ও নিরপেক্ষ হতে হবে। অপরাধী যে ধর্মেরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতেই হবে।
একটি শান্তিপূর্ণ, উন্নত ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের বুঝতে হবে—ধর্মীয় সহাবস্থান দুর্বলতা নয়, এটি শক্তি। অমুসলিমদের প্রতি সদাচরণ কোনো আপস নয়, বরং এটি আমাদের ধর্মীয় শিক্ষা, মানবিক দায় এবং রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার।
ন্যায়, সহানুভূতি ও মানবিকতাই হোক আমাদের পরিচয়—এটাই ইসলাম, এটাই সভ্যতা, এটাই ভবিষ্যৎ।