বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু ঘটনা আছে, যা শুধু সংবাদ নয়—সেগুলো ইতিহাসের দিক পরিবর্তন করে। তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন ঠিক তেমনই একটি ঘটনা। এটি কোনো দলীয় কর্মসূচি নয়, কোনো আনুষ্ঠানিক সফরও নয়—এটি ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ নির্বাচিত সরকারবিহীন, নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ এবং গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্র কার্যত একটি ক্ষমতার শূন্যতায় প্রবেশ করেছে। সেই শূন্যতার মধ্যেই তারেক রহমানের আগমন নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—
এটি কি কেবল বিএনপির পুনরুত্থান, নাকি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অনিবার্য পুনর্বিন্যাস?


পতনের পর যে বাংলাদেশ: রাষ্ট্র আছে, কিন্তু সরকার নেই

আজকের বাংলাদেশ একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকার আছে, কিন্তু তা নির্বাচিত নয়। প্রশাসন চলছে, কিন্তু তার পেছনে নেই জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা মূলত একটি সংকট ব্যবস্থাপনা কাঠামো, পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সমাধান নয়।

এই বাস্তবতায় তিনটি বড় সংকট স্পষ্ট—

  1. বৈধতার সংকট
  2. নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার অনিশ্চয়তা
  3. নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে ধোঁয়াশা

এই শূন্যতার মধ্যেই রাজনৈতিক শক্তিগুলো নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে। এবং এখানেই তারেক রহমানের আগমন রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ।


তারেক রহমান: নির্বাসন থেকে কেন্দ্রবিন্দুতে

এক দশকের বেশি সময় ধরে তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছিলেন শারীরিকভাবে অনুপস্থিত, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অনুপস্থিত ছিলেন না। তবে আজকের বাস্তবতা আলাদা। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তার দেশে ফিরে আসা ক্ষমতার ভারসাম্যকে বাস্তবভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে

এই আগমন তিনটি স্তরে প্রভাব ফেলছে—

১️⃣ বিরোধী রাজনীতির শূন্যতা পূরণ

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে কার্যকর বিরোধী রাজনীতি ছিল না। তারেক রহমানের উপস্থিতি সেই শূন্যতায় একটি শক্ত কেন্দ্র তৈরি করেছে।

২️⃣ নির্বাচনী রাজনীতিতে বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বিতা

ভবিষ্যৎ নির্বাচন যদি সত্যিই অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক হয়, তবে সেখানে একটি সংগঠিত ও নেতৃত্বসম্পন্ন বিরোধী শক্তি অপরিহার্য। তারেক রহমান সেই বাস্তবতা ফিরিয়ে এনেছেন।

৩️⃣ রাষ্ট্রক্ষমতার নতুন হিসাব

আজ বাংলাদেশের ক্ষমতা কেবল প্রশাসনের হাতে নয়—এটি ছড়িয়ে আছে রাজপথ, রাজনৈতিক দল এবং জনমতের মধ্যে। তারেক রহমান সেই সমীকরণের একটি প্রধান অংশে পরিণত হয়েছেন।


নিরাপত্তা বাস্তবতা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি

তারেক রহমানের আগমনের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—নিরাপত্তা। কারণ বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামো এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাচ্ছে, প্রশাসন রূপান্তরের মধ্যে রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ঝুঁকিগুলো হলো—

  • রাজনৈতিক সংঘর্ষের আশঙ্কা
  • প্রতিশোধমূলক সহিংসতা
  • উসকানিমূলক গুজব ও বিভাজন
  • রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার সুযোগে চরমপন্থার মাথাচাড়া

এখানে দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভাষা ও অবস্থানের ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করছে। তিনি যদি সংযমী ও রাষ্ট্রনির্ভর বার্তা দেন, তবে তা স্থিতিশীলতা আনতে পারে। উল্টোটা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।


নির্বাচন: এখন আর বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন

বাংলাদেশের সামনে এখন নির্বাচন কোনো রাজনৈতিক অপশন নয়—এটি রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার শর্ত। নির্বাচিত সরকার ছাড়া—

  • অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে না
  • আন্তর্জাতিক আস্থা ফিরবে না
  • সামাজিক স্থিতি আসবে না

এই বাস্তবতায় তারেক রহমানের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যদি একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সময়সীমাবদ্ধ নির্বাচনের দাবিতে স্পষ্ট ভূমিকা নেন, তবে তিনি কেবল দলীয় নেতা নয়, রাষ্ট্রীয় রাজনীতির একজন কেন্দ্রীয় খেলোয়াড় হয়ে উঠবেন।


আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি: বিশ্ব তাকিয়ে আছে

আজকের বাংলাদেশ শুধু অভ্যন্তরীণ সংকটে নেই; এটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মধ্যেও রয়েছে। উন্নয়ন অংশীদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, কূটনৈতিক মিশন—সবার প্রশ্ন একটাই:
বাংলাদেশ কি গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরবে?

তারেক রহমানের আগমন এই প্রশ্নে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ বিশ্ব জানে—বাংলাদেশে টেকসই গণতন্ত্র ফিরতে হলে সব বড় রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ প্রয়োজন।


ভবিষ্যৎ: ঝুঁকির মাঝেই সুযোগ

তারেক রহমানের আগমন বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিও, আবার সুযোগও।

ঝুঁকি—যদি রাজনীতি প্রতিশোধ ও সংঘাতের দিকে যায়।
সুযোগ—যদি এটি একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সূচনা করে।

আজ বাংলাদেশ এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—
ক্ষমতার শূন্যতা কি দীর্ঘায়িত হবে, নাকি গণতন্ত্রের মাধ্যমে পূরণ হবে?


উপসংহার: ইতিহাসের ভার এখন কাঁধে

তারেক রহমান আজ আর কেবল একটি দলের নেতা নন।
তিনি এখন একটি সংকটকালে প্রত্যাবর্তন করা রাজনৈতিক চরিত্র, যার প্রতিটি বক্তব্য, সিদ্ধান্ত ও অবস্থান বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে।

শেখ হাসিনা–পরবর্তী বাংলাদেশ এখনো লেখা হয়নি।
এই অধ্যায় কীভাবে লেখা হবে—তা নির্ভর করবে দায়িত্বশীল রাজনীতি, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ওপর।

তারেক রহমানের আগমন সেই অধ্যায়ের প্রথম বড় বাক্য।
শেষটা কেমন হবে—তা এখনো বাংলাদেশের হাতে।

— Md. Towhidul Islam

One thought on “তারেক রহমানের আগমন: ক্ষমতার শূন্যতায় বাংলাদেশের নতুন মোড়”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *