বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা | ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সেই রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল, ঠিক দেড় বছর পর ২০২৫-এর ডিসেম্বরে এসে সেই ‘নতুন বাংলাদেশ’ এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। একদিকে নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অন্যদিকে পুরোনো পরাশক্তির রাজকীয় প্রত্যাবর্তন—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজপথ এখন এক আগ্নেয়গিরি। এই আগ্নেয়গিরির কেন্দ্রে রয়েছে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (NCP), যাদের ওপর ভরসা করেছিল দেশের জেনারেশন-জেড বা তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু গত ৪৮ ঘণ্টায় দলটির ভেতরে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে, তা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এনসিপিতে বিদ্রোহ: আদর্শ বনাম কৌশল
গত শনিবার রাতে রাজধানীর একটি গোপন আস্তানায় এনসিপির ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতার রুদ্ধশ্বাস বৈঠক শেষে যে ঘোষণা আসে, তা রাজনৈতিক মহলে বোমার মতো আছড়ে পড়েছে। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে দেওয়া এক আল্টিমেটামে এই নেতারা জানিয়েছেন, যদি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাথে কোনো ধরনের নির্বাচনী জোট বা আসন ভাগাভাগির চুক্তি করা হয়, তবে তারা একযোগে দল থেকে পদত্যাগ করবেন।
বিদ্রোহী নেতাদের দাবি, তারা একটি ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত’ এবং ‘বৈষম্যহীন’ বাংলাদেশের জন্য লড়াই করেছিলেন। কিন্তু জামায়াতের মতো একটি ধর্মভিত্তিক দলের সাথে হাত মেলানো জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিট বা চেতনার সাথে চরম বেঈমানি। এনসিপির ভেতরে এই ফাটল কেবল একটি দলের ভাঙন নয়, বরং এটি তরুণ প্রজন্মের সেই স্বপ্নের ভাঙন, যারা তথাকথিত ‘বাইনারি পলিটিক্স’ বা দুই দলের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন: দাবার ছকে নতুন চাল
যখন এনসিপি নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন দৃশ্যপটের ঠিক উল্টো দিকে ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকা বিমানবন্দরে নামার পর তাকে ঘিরে যে জনসমুদ্র তৈরি হয়েছিল, তা সাম্প্রতিককালের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
গতকাল (২৭ ডিসেম্বর) তিনি অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তার মধ্যে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে নিজের ভোটার নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল সিগন্যাল। তারেক রহমান কেবল একজন নেতা হিসেবে ফিরছেন না, তিনি ফিরছেন একজন ‘ভোট ম্যাগনেট’ হিসেবে। ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বগুড়া-৬ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তার এই সক্রিয় উপস্থিতি এবং ভোটার তালিকায় নাম তোলা বিএনপির কর্মীদের মধ্যে যে প্রাণের সঞ্চার করেছে, তা মোকাবিলা করা যেকোনো নতুন দলের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড এবং মোবিউক্রেসির উত্থান
এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই গত ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং জুলাই আন্দোলনের পরিচিত মুখ শরীফ ওসমান হাদি। গত ১২ ডিসেম্বর তাকে ঢাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করা হয়েছিল। হাদির মৃত্যু ঢাকাকে রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
এই মৃত্যুর জেরে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি গণমাধ্যম প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ভয়াবহ হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একদল উগ্রবাদী জনতা ‘আদর্শিক প্রতিশোধের’ দোহাই দিয়ে এই হামলা চালিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক একে ‘গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য অশনিসংকেত’ বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই অস্থিরতার পেছনে কার হাত? অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম এই হামলার জন্য সরকারের ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটি পক্ষকে দায়ী করেছেন। এই বক্তব্য সরকারের ভেতরেও এক ধরনের অবিশ্বাসের দেওয়াল তৈরি করেছে।
নির্বাচন ২০২৬: কার পাল্লা ভারী?
নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পর এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে দেশের ইতিহাসে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। তবে সমীকরণগুলো এখন আর আগের মতো সহজ নেই।
- বিএনপি জোট: তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের পর বিএনপি এখন সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে। তারা এককভাবে অথবা ছোট দলগুলোকে নিয়ে একটি ‘মহাসংহতি’ তৈরির পথে হাঁটছে। তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ১ কোটি কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে, যা বেকার তরুণদের বড় অংশকে আকর্ষণ করছে।
- এনসিপি ও তৃতীয় শক্তি: এনসিপি শুরুতে অনেক আশা জাগালেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং জামায়াত-ঘেঁষা নীতির অভিযোগে তাদের জনপ্রিয়তা এখন নিম্নমুখী। বিশেষ করে তাসনিম জারার মতো জনপ্রিয় মুখগুলো যখন স্বতন্ত্রভাবে লড়ার ঘোষণা দেন, তখন দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকট হয়ে ওঠে।
- জামায়াত ফ্যাক্টর: জামায়াতে ইসলামী এখন পর্যন্ত নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে, তবে তাদের ক্যাডার ভিত্তিক শক্তি এবং সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক যেকোনো দলের জয়-পরাজয়ের নির্ণায়ক হতে পারে।
জনতার আদালত ও আগামীর বাংলাদেশ
ঢাকার শাহবাগ থেকে শুরু করে চায়ের দোকান পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মুখে এখন একটাই প্রশ্ন—ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আমরা কি সত্যিই একটি স্থিতিশীল সরকার পাব? নাকি বাংলাদেশ আবারও প্রতিহিংসার রাজনীতিতে ডুবে যাবে?
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মাঠ এখন ফাঁকা, কিন্তু এই ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার লড়াইয়ে যারা নামছে, তাদের নিজেদের ঘরই এখন অগোছালো। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন, অন্যদিকে উগ্রবাদ ও মব-ভায়োলেন্সের (Mob Violence) হুমকি।
“মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল, কিন্তু সেই পরিবর্তন যদি নতুন কোনো স্বৈরতন্ত্র বা অস্থিরতার জন্ম দেয়, তবে এই ত্যাগের কোনো মূল্য থাকবে না,” — রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. এমরান হোসেন।
ফেব্রুয়ারির অগ্নিপরীক্ষা কেবল কোনো রাজনৈতিক দলের পরীক্ষা নয়, এটি বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের পরীক্ষা। আমরা কি পারবো একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে, নাকি রাজনীতির দাবার চালে আবারও হেরে যাবে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন? উত্তরটা হয়তো ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট পেপারই বলে দেবে।