বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু সত্য আছে, যেগুলো উচ্চারণ না করলেও সবাই জানে—আর উচ্চারণ করলেই বিতর্ক শুরু হয়। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে তেমনই এক অস্বস্তিকর সত্য হলো: আওয়ামী সমর্থকদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশে কেউ ক্ষমতায় যেতে পারে না। দল নিষিদ্ধ, প্রতীক নেই, মঞ্চ ফাঁকা—কিন্তু ভোটের হিসাব? সেখানে আওয়ামী সমর্থকরাই এখনো সবচেয়ে বড় শক্তি।
এই বাস্তবতা অস্বীকার করা যেমন রাজনৈতিক আত্মপ্রবঞ্চনা, তেমনি এটি উপেক্ষা করা মানেই নির্বাচনী আত্মঘাত।
আওয়ামী লীগ নেই—এই কথাটি আংশিক সত্য
কাগজে-কলমে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হতে পারে। কিন্তু রাজনীতি কেবল গেজেট নোটিফিকেশনে চলে না। মাঠে, চায়ের দোকানে, পাড়া-মহল্লায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে—আওয়ামী সমর্থকরা রয়েই গেছে। তারা কোনো অদৃশ্য জনগোষ্ঠী নয়; তারা এই রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংগঠিত রাজনৈতিক সমাজ।
প্রশ্ন হলো—এই জনগোষ্ঠী যদি ভোটকেন্দ্রে না যায়, বা কৌশলগতভাবে ভোট দেয়, তাহলে কী হবে?
উত্তর সহজ: নির্বাচনের ফল বদলে যাবে।
নির্বাচনের আসল নিয়ন্ত্রক কারা?
বাংলাদেশের অধিকাংশ আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান খুবই সামান্য। সেখানে ১০–১৫ শতাংশ ভোটার যদি সিদ্ধান্ত বদলায়, পুরো মানচিত্র উল্টে যায়। আওয়ামী সমর্থকদের ভোটব্যাংক ঠিক এই জায়গাতেই ভয়ংকর।
তারা যদি কাউকে সমর্থন না করে, সে হারবে।
তারা যদি কাউকে অপছন্দ করে, তার পরাজয় নিশ্চিত হবে।
অর্থাৎ, তারা রাজা বানানোর চেয়ে রাজা নামানোর ক্ষমতা বেশি রাখে।
এটাই সেই বাস্তবতা, যা অনেক দল প্রকাশ্যে স্বীকার করে না—কিন্তু গোপনে ভয় পায়।
নিষিদ্ধ থেকেও নির্বাচনে আওয়ামী লীগ—কীভাবে?
খোলাখুলি বলাই ভালো: এই নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ থাকবে—নাম ছাড়া, প্রতীক ছাড়া, কিন্তু প্রভাব ছাড়া নয়।
স্বতন্ত্র প্রার্থী কেন হঠাৎ “উন্নয়ন”, “স্থিতিশীলতা” আর “৭১-এর চেতনা”র কথা বলছে?
ছোট দলগুলো কেন হঠাৎ ভাষা নরম করছে?
কেন কেউ আর প্রকাশ্যে ‘আওয়ামী শিকার’ হওয়ার হুমকি দিচ্ছে না?
কারণ সবাই জানে—এই ভোটব্যাংককে পুরোপুরি শত্রু বানানো মানেই রাজনৈতিক আত্মহত্যা।
আওয়ামী সমর্থকরা কী চায়?
তারা ক্ষমতা নয়—নিরাপত্তা চায়।
প্রতিশোধ নয়—অস্তিত্ব চায়।
তারা এমন শক্তিকে ভোট দিতে পারে, যে তাদের নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দেয় না।
এ কারণেই এই নির্বাচনে আওয়ামী সমর্থকদের ভোট হবে—
- নীরব
- কৌশলগত
- এবং অত্যন্ত হিসেবি
এবং এই হিসেবেই অনেক বড় বড় রাজনৈতিক স্বপ্ন ভেঙে যেতে পারে।
যারা বলছে “আওয়ামী অধ্যায় শেষ”—তারা ভুল পড়ছে
বাংলাদেশের ইতিহাসে একাধিকবার আওয়ামী লীগকে ‘শেষ’ করে দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই দলকে সরানো যায়, কিন্তু সমর্থকদের মুছে ফেলা যায় না।
বরং নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় সমর্থনকে আরও জমাট বাঁধায়।
নির্যাতন অনেক সময় ভোটকে আরও প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে।
যারা ভাবছে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ মানেই পথ পরিষ্কার—তারা হয় ইতিহাস জানে না, নয়তো রাজনীতির মনস্তত্ত্ব বোঝে না।
গণতন্ত্র বনাম সুবিধাজনক নির্বাচন
এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি গণতন্ত্রের পরীক্ষাও। দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী যদি মনে করে—এই নির্বাচন তাদের জন্য নয়, তাদের বিরুদ্ধে—তাহলে সে নির্বাচন যতই ‘আইনসম্মত’ হোক, নৈতিকভাবে দুর্বল হবে।
আওয়ামী সমর্থকদের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন হয়তো হবে, কিন্তু সেটি প্রশ্নবিদ্ধ হবে—দেশে ও বিদেশে।
উপসংহার: যাদের ছাড়া জয় অসম্ভব
শেষ পর্যন্ত কঠিন সত্যটি বলতেই হয়—
বাংলাদেশে আওয়ামী সমর্থকদের বাদ দিয়ে কেউ জিততে পারে না।
তারা হয়তো ব্যানারে নেই, পোস্টারে নেই, মিছিলে নেই—কিন্তু ব্যালটের অঙ্কে তারাই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। এই নির্বাচনে কে সরকার গঠন করবে, তা নির্ধারিত হবে তাদের নীরব সিদ্ধান্তে।
দল নিষিদ্ধ করা যায়, প্রতীক কেড়ে নেওয়া যায়—
কিন্তু ভোটের স্মৃতি, পরিচয় আর রাজনৈতিক বিশ্বাস নিষিদ্ধ করা যায় না।
এবং ঠিক এখানেই আওয়ামী সমর্থকরা হয়ে ওঠে এই নির্বাচনের সবচেয়ে অস্বস্তিকর, সবচেয়ে শক্তিশালী—এবং সবচেয়ে উপেক্ষিত বাস্তবতা।