ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি ততই এক অদৃশ্য চাপের ভেতর প্রবেশ করছে। ইতিহাস বলে, নির্বাচন মানেই শুধু রাজনৈতিক উত্তাপ নয়—ব্যাংকিং খাত, শেয়ার বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য এটি এক ধরনের স্ট্রেস টেস্ট। প্রশ্ন হলো, এই পরীক্ষায় বাংলাদেশ কি উত্তীর্ণ হবে, নাকি পুরোনো ক্ষতগুলো আরও গভীর হবে?


ব্যাংকিং খাত: নির্বাচনী অর্থনীতি বনাম বাস্তব সংকট

নির্বাচনের আগে সরকার সাধারণত অর্থনীতিকে “ভালো দেখাতে” চায়। কিন্তু ব্যাংকিং খাতে সেই সুযোগ এখন প্রায় নেই বললেই চলে।

🔴 খেলাপি ঋণ: লুকানো বাস্তবতা আর ঢাকতে পারছে না কেউ
নির্বাচন সামনে রেখে খেলাপি ঋণ ‘উইন্ডো ড্রেসিং’-এর চেষ্টা শুরু হলেও বাস্তবতা নির্মম। বহু ব্যাংকে প্রকৃত খেলাপি ঋণ ২৫–৩০ শতাংশেরও বেশি। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া নির্বাচন-পূর্ব সময়ে প্রায় অসম্ভব।

🔴 নির্বাচনী বছরে ঋণ বিতরণের চাপ
সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ তৈরি হয়—“প্রবৃদ্ধি দেখাতে হবে।” ফলে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে ঋণ বিতরণ বাড়ে, যা নির্বাচনের পর নতুন করে ব্যাংকিং সংকট ডেকে আনে। ২০২৬ সালও এর ব্যতিক্রম হবে—এমন নিশ্চয়তা কোথায়?

🔴 ব্যাংক একীভূতকরণ: সংস্কার না কি রাজনৈতিক ক্ষতি ব্যবস্থাপনা?
কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগকে সরকার সংস্কার হিসেবে তুলে ধরলেও বাজারের বড় অংশ এটিকে নির্বাচন-পূর্ব আর্থিক বিস্ফোরণ ঠেকানোর কৌশল হিসেবে দেখছে। ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ এখানে কার্যত উপেক্ষিত।


শেয়ার বাজার: নির্বাচন যত কাছে, অনিশ্চয়তা তত গভীর

বাংলাদেশের শেয়ার বাজার ঐতিহাসিকভাবেই নির্বাচন-সংবেদনশীল। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সামনে রেখে বাজারে সেই পুরোনো লক্ষণ আবারও স্পষ্ট।

📉 বিনিয়োগকারীর আস্থাহীনতা
রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থাকলে বড় বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষায় থাকে। বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ কার্যত স্থবির। নির্বাচনকালীন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিশ্চয়তা বাজারকে দুর্বল করে তুলছে।

📉 ব্যাংক ও ফাইন্যান্স শেয়ারের চাপ
ব্যাংকিং খাতের সংকট সরাসরি শেয়ার বাজারে প্রতিফলিত হচ্ছে। একীভূতকরণ, ক্যাপিটাল শর্টফল ও লোকসানি ব্যালান্স শিট—সব মিলিয়ে ব্যাংক শেয়ার এখন বিনিয়োগকারীদের জন্য আতঙ্কের নাম।

📉 নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরবতা
নির্বাচনের আগে বড় ধরনের বাজার সংস্কার বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ সাধারণত দেখা যায় না। ফলে বাজারে গুজব, কারসাজি ও অস্বচ্ছতা বাড়ে—যা ছোট বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে।


সামগ্রিক অর্থনীতি: ভোটের আগে স্বস্তি, পরে হিসাব

নির্বাচনী অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি, দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি

⚠️ রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যয় বৃদ্ধি
নির্বাচনের আগে উন্নয়ন ব্যয়, ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানোর প্রবণতা থাকে। এর অর্থ জোগান দিতে গিয়ে সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ায়, যা বেসরকারি বিনিয়োগকে আরও কোণঠাসা করে।

⚠️ মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার চাপ
পরিসংখ্যান হয়তো নিয়ন্ত্রিত দেখাবে, কিন্তু বাস্তব বাজারে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের জন্য বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হতে পারে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, এই চাপ তত স্পষ্ট হয়।

⚠️ ডলার ও রিজার্ভ: দৃশ্যমান স্থিতিশীলতা, অদৃশ্য দুর্বলতা
রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়িয়ে রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চললেও আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিতে নির্বাচনের পর চাপ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।


সম্ভাবনা: নির্বাচন কি সংস্কারের সুযোগ হতে পারে?

সব চিত্রই যে অন্ধকার—তা নয়।

রাজনৈতিক বৈধতা এলে বিনিয়োগের দ্বার খুলতে পারে
একটি গ্রহণযোগ্য ও স্থিতিশীল নির্বাচন হলে বিদেশি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হবে।

ব্যাংকিং সংস্কারে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ
নির্বাচনের পর রাজনৈতিক চাপ কিছুটা কমলে খেলাপি ঋণ, ব্যাংক পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোতে বাস্তব সংস্কার সম্ভব।

শেয়ার বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ফেরার সম্ভাবনা
নীতি ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে বাজার ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।


সবচেয়ে বিতর্কিত প্রশ্ন

👉 ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচন কি অর্থনীতিকে বাঁচানোর শেষ সুযোগ, নাকি সংকট ঢাকার আরেকটি পর্ব?

যদি নির্বাচন শুধু ক্ষমতা ধরে রাখার অঙ্কে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতি তার মূল্য দেবে বহু বছর ধরে। আর যদি এটি সত্যিকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রিসেটের সূচনা হয়—তাহলে বাংলাদেশ এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।


উপসংহার

ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণের মুহূর্ত। ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা, শেয়ার বাজারের আস্থাহীনতা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ—সব মিলিয়ে সময় এখন সিদ্ধান্তের।
ভোটের আগে নয়, ভোটের পর সত্যিকারের সংস্কারই ঠিক করবে বাংলাদেশ কোন পথে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *