বাংলাদেশের চা শিল্প কেবল একটি সফল অর্থনৈতিক খাতই নয়, বরং এটি ১৬৭ বছরের এক দীর্ঘ শৃঙ্খল আর বঞ্চনার ইতিহাস। চা বাগানগুলো দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখলেও (২০২৩ সালে সর্বোচ্চ রেকর্ড ১০২.৯২ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে), এই সফলতার কারিগররা আজও আধুনিক বিশ্বের প্রেক্ষাপটে ‘সর্বনিম্ন মজুরিপ্রাপ্ত’ জনগোষ্ঠী। এই বঞ্চনা কেবল আর্থিক নয়, বরং আইনি এবং কাঠামোগত।
১. মজুরি বৈষম্য ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (ILO)
আইএলও (ILO) কনভেনশন ৯৮ (যৌথ দরকষাকষি) এবং কনভেনশন ১৩১ (ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ) অনুযায়ী, একজন শ্রমিকের মজুরি হতে হবে তার জীবনধারণের ব্যয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। অথচ বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের জন্য বর্তমান মজুরি কাঠামো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী।
- পরিসংখ্যান: ২০২৩-২৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৭০ টাকা (প্রায় ১.৪২ মার্কিন ডলার), যা বিশ্বব্যাংকের নির্ধারিত চরম দারিদ্র্যসীমার (দৈনিক ২.১৫ ডলার) অনেক নিচে।
- তুলনামূলক চিত্র: প্রতিবেশী দেশ ভারতের আসামে চা শ্রমিকের মজুরি ২৫০ রুপি (৩৩০ টাকা) এবং শ্রীলঙ্কায় তা প্রায় ১৭০০ লঙ্কান রুপি (৬৭৪ টাকা)। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের ($২,৭৮৪) তুলনায় চা শ্রমিকের এই আয় বৈষম্য ভয়াবহ।
২. বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬: বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ (BLA 2006) অনুযায়ী শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কাজ, ওভারটাইম ভাতা এবং উৎসব ছুটির অধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে চা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই আইনের প্রয়োগে বিস্তর ফাঁক রয়ে গেছে।
- নিযুক্তিপত্রের অভাব: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) এর তথ্যমতে, প্রায় ৯৬ শতাংশ চা শ্রমিকের কোনো আনুষ্ঠানিক নিযুক্তিপত্র নেই। ফলে তারা শ্রম আইনের পূর্ণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।
- ওভারটাইম লঙ্ঘন: শ্রম আইনের ধারা ১০৮ অনুযায়ী অতিরিক্ত কাজের জন্য দ্বিগুণ মজুরি দেওয়ার কথা থাকলেও, চা বাগানে অতিরিক্ত পাতা তোলার বিনিময়ে অত্যন্ত সামান্য ‘পুরস্কার’ দেওয়া হয়, যা আইনিভাবে ওভারটাইম হিসেবে গণ্য হয় না।
৩. আবাসন ও ভূমি অধিকার: একটি ‘সংবিধিবদ্ধ’ সংকট
চা শ্রমিকদের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো তাদের আবাসন সংকট। বাংলাদেশ চা বোর্ড এবং ‘বাংলাদেশ চা শ্রমিক কল্যাণ তহবিল আইন ২০১৬’ অনুযায়ী মালিকপক্ষ শ্রমিকদের জন্য মানসম্মত বাসস্থান নিশ্চিত করতে বাধ্য। কিন্তু বাস্তবে:
- প্রায় ৩২,০০০ এর বেশি স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিকের জন্য কোনো পৃথক ঘরের ব্যবস্থা নেই।
- তারা বংশপরম্পরায় যে জমিতে বাস করছেন, তার ওপর তাদের কোনো আইনি মালিকানা নেই। মালিকপক্ষ কাজ থেকে বরখাস্ত করলে যেকোনো সময় তাদের বাস্তুচ্যুত হতে হয়।
৪. স্বাস্থ্য ও নারী শ্রমিকের অধিকার
বাংলাদেশের চা শ্রমিকের প্রায় ৬৪ শতাংশই নারী। ‘মাতৃত্বকালীন সুবিধা’ (Maternity Benefit) আইন অনুযায়ী নারী শ্রমিকদের বেতনসহ ১৬ সপ্তাহের ছুটি পাওয়ার কথা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তারা পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও বিশ্রাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ইউনিসেফের তথ্যমতে, চা বাগানের ৪৫ শতাংশ শিশুই অপুষ্টিতে ভুগছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি রুগ্ণ প্রজন্ম তৈরি করছে।
৫. উত্তরণের পথ ও সুপারিশ
এই গভীর মানবিক ও আইনি সংকট সমাধানে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো জরুরি:
- ন্যূনতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন: মূল্যস্ফীতির কথা বিবেচনা করে মজুরি কাঠামো প্রতি দুই বছর পর পর আধুনিকীকরণ করা।
- আইএলও কনভেনশন ১৬৯ ও ১০৭: চা বাগানে আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহ বাস্তবায়ন করা।
- শ্রম পরিদর্শন শক্তিশালীকরণ: কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) এর মাধ্যমে চা বাগানগুলোতে নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা।
চায়ের কাপে যে ধোঁয়া ওঠা প্রশান্তি আমরা পাই, তা আসলে হাজারো শ্রমিকের দীর্ঘশ্বাসের ফসল। উন্নয়নশীল দেশের তকমা লাগানো বাংলাদেশে এই ধরণের ‘আধুনিক দাসত্ব’ কেবল সংবিধানের নীতিমালার পরিপন্থী নয়, বরং এটি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। চা শ্রমিকদের কেবল ‘শ্রমিক’ নয়, ‘নাগরিক’ হিসেবে তাদের সাংবিধানিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া আজ সময়ের দাবি।