বাংলাদেশ বর্তমানে এক ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। গত কয়েক দশকের প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা, খেলাপি ঋণের বোঝা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের মতো চ্যালেঞ্জগুলো অর্থনীতির গতিকে মন্থর করে দিয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্যাংকিং খাতকে ঢেলে সাজানোর জন্য আমূল সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং স্থিতিশীল অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে এই নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে।
১. ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কার
আগস্ট ২০২৪-এর পর ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ ছিল বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন। এস আলম গ্রুপসহ বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কবজায় থাকা ব্যাংকগুলোকে দখলমুক্ত করে পেশাদার বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
- ব্যাংক কমিশন গঠন: দীর্ঘদিনের দাবির মুখে ব্যাংকিং খাতের শ্বেতপত্র প্রকাশের জন্য এবং টেকসই সংস্কারের রূপরেখা তৈরিতে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘ব্যাংক কমিশন’ গঠনের কাজ শুরু হয়েছে।
- বিলাসবহুল ব্যয় নিয়ন্ত্রণ: ব্যাংকগুলোর অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
২. খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট মোকাবিলা
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম প্রধান ক্ষত হলো খেলাপি ঋণ (NPL)। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এটি কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করেছে।
- ঋণ অবলোপন ও পুনর্গঠন বন্ধ: রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ পুনর্গঠন বা গণহারে ঋণ মওকুফের সংস্কৃতি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
- তারল্য সহায়তা: তারল্য সংকটে ভোগা দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সহায়তা করার জন্য আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে গ্যারান্টি স্কিম চালু করা হয়েছে।
৩. মুদ্রা বিনিময় হার ও রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন রোধে এবং ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকার ‘ক্রলিং পেগ’ (Crawling Peg) পদ্ধতি এবং মার্কেট-ভিত্তিক বিনিময় হার চালুর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
- রেমিট্যান্স প্রবাহে গতি: প্রবাসীদের বৈধ পথে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত করতে ডলারের দাম বাজারের সাথে সমন্বয় করা হয়েছে। এতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রেমিট্যান্স ২ বিলিয়ন ডলারের ওপর স্থিতিশীল রয়েছে।
- রিজার্ভ সুরক্ষা: আইএমএফ (IMF)-এর বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের প্রকৃত হিসাব প্রকাশ শুরু হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে।
৪. মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজার তদারকি
বর্তমান অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ। মুদ্রাস্ফীতি ১০%-এর নিচে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি (Contractionary Monetary Policy) গ্রহণ করেছে।
- পলিসি রেট (Policy Rate) বৃদ্ধি: ব্যাংকগুলোর ঋণের খরচ বাড়িয়ে বাজারে অর্থের প্রবাহ কমানোর জন্য পলিসি রেট কয়েক দফায় বৃদ্ধি করা হয়েছে।
- সাপ্লাই চেইন সংস্কার: বাজারে কৃত্রিম সংকট রোধে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং সরাসরি উৎপাদনকারী থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৫. ডিজিটাল অর্থনীতি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি
স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। ‘বাংলা কিউআর’ এবং ‘বিনিময়’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক মূলধারায় নিয়ে আসা হচ্ছে।
| সূচক/খাত | বর্তমান অবস্থা (২০২৪-২৫) | গৃহীত পদক্ষেপ ও লক্ষ্যমাত্রা (২০২৬) |
|---|---|---|
| ব্যাংকিং সুশাসন | রাজনৈতিক প্রভাবে পর্ষদ গঠন | স্বাধীন ও পেশাদার ব্যাংক কমিশন গঠন |
| খেলাপি ঋণ (NPL) | রেকর্ড ২.৫ লাখ কোটি টাকা (প্রায়) | কড়া আইনি ব্যবস্থা ও পুনর্গঠন বন্ধের মাধ্যমে হ্রাস |
| মুদ্রাস্ফীতি | ৯.৫% – ১০% এর উপরে | মুদ্রানীতি সংকোচনের মাধ্যমে ৭% এ নামিয়ে আনা |
| বৈদেশিক রিজার্ভ | বিপিএম-৬ অনুযায়ী সংকুচিত | রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বাড়িয়ে রিজার্ভ পুনর্গঠন |
| বিনিময় হার | অস্থির ও ডলার সংকট | মার্কেট-ভিত্তিক ও ক্রলিং পেগ পদ্ধতি বাস্তবায়ন |
| আর্থিক অন্তর্ভুক্তি | আংশিক ডিজিটাল পেমেন্ট | ‘বাংলা কিউআর’ ও শতভাগ ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার |
৬. টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ
একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতির জন্য শুধু সংস্কারই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন এর ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশের জন্য আগামী দিনের মূল পথনকশা হওয়া উচিত:
- রপ্তানি বহুমুখীকরণ: শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভর না করে চামড়া, ওষুধ এবং আইটি খাতকে বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত করা।
- কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি: বাংলাদেশের কর আদায়ের হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। রাজস্ব খাতে অটোমেশন এবং এনবিআর (NBR)-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।
- বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণ: বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সংস্কারগুলো যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে বাংলাদেশ কেবল স্থিতিশীলতাই ফিরে পাবে না, বরং ২০৪১ সালের উন্নত সমৃদ্ধ দেশের লক্ষ্যমাত্রার দিকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাবে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন এবং জনগণের আস্থার প্রতিফলনই হবে এই সফলতার প্রধান চাবিকাঠি।