ঢাকা, বাংলাদেশ: দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ তার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই সাথে সেদিন সম্পন্ন হবে একটি ঐতিহাসিক গণভোট, যা দেশের সাংবিধানিক কাঠামো সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেবে। সব মিলিয়ে আগামী সপ্তাহের এই দিনটি কেবল ভোটের লড়াই নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার এক অগ্নিপরীক্ষা।
এক নজরে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোট
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এবার ১২ কোটি ৭৬ লাখেরও বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এর মধ্যে বড় একটি অংশ তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেনারেশন জেড’, যারা জুলাই বিপ্লবের মূল কারিগর ছিল।
- দুটি ব্যালট পেপার: এবার প্রত্যেক ভোটারকে দুটি করে ব্যালট দেওয়া হবে। একটি হবে ৩০০ সংসদীয় আসনের প্রার্থীর জন্য (সাদা ব্যালট) এবং অন্যটি হবে ‘জুলাই সনদ’ বা সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে-বিপক্ষে গণভোটের জন্য (গোলাপি ব্যালট)।
- ডাকযোগে ভোট: এই প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা ডাকযোগে (Postal Ballot) ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।
- না-ভোটের প্রত্যাবর্তন: ভোটারদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে ব্যালট পেপারে পুনরায় ‘না’ ভোট (No Vote) অপশনটি ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
নির্বাচনী মাঠের সমীকরণ: কারা আছেন লড়াইয়ে?
বিগত চার নির্বাচনের বিজয়ী দল আওয়ামী লীগ বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে স্থগিত থাকায় এবারের নির্বাচনী লড়াইয়ের সমীকরণ একদম ভিন্ন। এবারের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে প্রধানত দুটি শিবিরের মধ্যে:
১. বিএনপি (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল): তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ৩০০ আসনেই তাদের প্রার্থী ও জোটগত প্রার্থী দিয়েছে। তারা দীর্ঘ সময় পর ক্ষমতায় ফিরতে মরিয়া।
২. ১১ দলীয় জোট ও জামায়াত: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আসা ‘জাতীয় নাগরিক দল’ (NCP) সহ ১১টি দলের জোট একটি শক্তিশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ও ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী ভোটারদের মধ্যে এদের প্রভাব চোখে পড়ার মতো।
এছাড়াও জাতীয় পার্টি (এরশাদ), বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দেশের বিভিন্ন আসনে তাদের প্রার্থী দিয়ে লড়াইকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে। ১,৯৮১ জন প্রার্থীর এই বিশাল প্রতিযোগিতায় কে শেষ হাসি হাসবেন, তা এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।
জুলাই সনদ: গণভোটের গুরুত্ব
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর গণভোট। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে ‘জুলাই সনদ’ প্রস্তাব করেছে, তাতে প্রধানত চারটি বড় পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে:
- প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল: কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
- দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ: সংসদে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ চালুর প্রস্তাব।
- তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা: নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থাকে স্থায়ী রূপ দান।
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বাধীন বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটাররা যদি ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করেন, তবে বাংলাদেশের ক্ষমতার ভারসাম্যে এক আমূল পরিবর্তন আসবে।
চ্যালেঞ্জ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ
এত বড় যজ্ঞের আয়োজন যেমন আশার আলো দেখাচ্ছে, তেমনি চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিগত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে। তবে নির্বাচন কমিশন এবং সেনাবাহিনী আশ্বস্ত করেছে যে, ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।
এবারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ভারত, নেপাল, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩৩০ জনেরও বেশি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক উপস্থিত থাকছেন। যা এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে বিশ্বদরবারে ফুটিয়ে তুলবে।
উপসংহার
১২ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়, এটি ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নের প্রতিফলন। দেশ কী আবার পুরনো ধারার রাজনীতিতে ফিরবে, নাকি একটি সংস্কারমুখী আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করবে—তার উত্তর লুকিয়ে আছে ওই দিনটির ব্যালট বাক্সে। ভোটারদের দায়িত্ব এখন অনেক বেশি, কারণ তাদের একটি ছোট টিক চিহ্ন নির্ধারণ করবে আগামীর সুসংহত ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ।