আওয়ামী লীগের উন্নয়ন অধ্যায়, ইউনুস সরকারের অন্তর্বর্তী সময় এবং বাংলাদেশের সামনে আগামীকালের রায়

আজ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। ঠিক এক দিন পর—১২ ফেব্রুয়ারি—বাংলাদেশের জনগণ আবার ব্যালটের সামনে দাঁড়াবে। এটি শুধু আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন নয়; এটি এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের পরবর্তী দিকনির্দেশ নির্ধারণের মুহূর্ত।

একদিকে আছে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের উন্নয়ন ও বিতর্কের উত্তরাধিকার, অন্যদিকে আছে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বল্পমেয়াদি কিন্তু ঐতিহাসিক দায়িত্ব। এই দুই সময়কে পাশাপাশি রেখে দেখলেই বোঝা যায়—আগামীকালের নির্বাচন আসলে অতীতের বিচার এবং ভবিষ্যতের চুক্তি, দুটোই।

আগামী নির্বাচনে কে জয়ী হবে বলে আপনি মনে করেন?

View Results

Loading ... Loading ...

আওয়ামী লীগ: দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের অধ্যায়

২০০৯ থেকে ২০২৪—এই প্রায় দেড় দশক আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ একটানা শাসনকাল। এই সময়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং দৃশ্যমান অবকাঠামোগত রূপান্তর

অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামাজিক পরিবর্তন

এই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ, নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ—এসব সূচকে অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে পোশাক খাত, প্রবাসী আয় এবং অবকাঠামো নির্মাণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি ছিল।

চার্ট ১: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সামগ্রিক প্রবণতা (ধারণামূলক)

বছর/পর্বঅর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অবস্থামন্তব্য
২০০৯–২০১২মাঝারিবৈশ্বিক মন্দা পরবর্তী পুনরুদ্ধার
২০১৩–২০১৬ঊর্ধ্বমুখীঅবকাঠামো ও রপ্তানি সম্প্রসারণ
২০১৭–২০১৯উচ্চমেগা প্রকল্প ও পোশাক খাত
২০২০নিম্নমুখীকোভিড–১৯
২০২১–২০২৩পুনরুদ্ধারভ্যাকসিন, রপ্তানি পুনরুজ্জীবন
২০২৪–২০২৫স্থবিররাজনৈতিক রূপান্তরকাল

আওয়ামী লীগ আমলে প্রবৃদ্ধি ছিল ধারাবাহিক; অন্তর্বর্তী সময়ে স্থিতিশীলতা অগ্রাধিকার পায়

দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়—এসব কারণে অনেক মানুষ বাস্তব সুফল পেয়েছেন। গ্রাম ও শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল সেবার বিস্তার ঘটেছে।

অবকাঠামো: দৃশ্যমান উন্নয়ন

পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, এক্সপ্রেসওয়ে—এই প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রতীক হয়ে ওঠে। এগুলো শুধু স্থাপনা নয়; এগুলো রাষ্ট্রের সক্ষমতা প্রদর্শনের বার্তা বহন করেছে।

তবে একইসঙ্গে উঠেছে প্রশ্ন:

  • প্রকল্প ব্যয় কতটা যৌক্তিক
  • ঋণ ও আর্থিক ঝুঁকি
  • দীর্ঘমেয়াদে রিটার্ন

গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক বিতর্ক

এই উন্নয়নের ছায়াতেই ছিল সবচেয়ে বড় বিতর্ক। নির্বাচন ব্যবস্থা, বিরোধী রাজনীতির পরিসর, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—এসব ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে।

২০২৪ সালের গণআন্দোলন মূলত এই দীর্ঘদিনের জমে থাকা রাজনৈতিক অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ।

ইউনুস সরকার: অন্তর্বর্তী সময়, অন্তর্বর্তী দায়িত্ব

২০২৪ সালের পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, তার চরিত্র ছিল ভিন্ন। এটি কোনো উন্নয়নমূলক নির্বাচিত সরকার নয়; এটি একটি সংক্রমণকালীন প্রশাসন

মূল লক্ষ্য ও দর্শন

এই সরকারের লক্ষ্য ছিল:

  • রাষ্ট্রযন্ত্র সচল রাখা
  • রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানো
  • নির্বাচন ও প্রশাসনিক সংস্কার
  • একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি

অর্থাৎ, এটি ক্ষমতার সরকার নয়, প্রক্রিয়ার সরকার

সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা

স্বল্প সময়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার উদ্যোগ—এসব ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত।

তবে সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট:

  • অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা
  • আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বিচ্ছিন্ন অস্থিরতা
  • রাজনৈতিক ঐকমত্যের ঘাটতি

এগুলো অস্বাভাবিক নয়, কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা ও সময়—দুটোই সীমিত।

আগামীকালের নির্বাচন: কী নিয়ে ভোট?

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে তিনটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়।

১. অংশগ্রহণ ও বৈধতা

এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—জনগণ কতটা আস্থা নিয়ে ভোট দেবে?
ভোটার উপস্থিতি শুধু সংখ্যা নয়; এটি আগামী সরকারের রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি।

২. রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস

দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলো, নতুন রাজনৈতিক শক্তি এবং নাগরিক সমাজ—সবাই নতুন করে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করছে। এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।

৩. অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতা

নির্বাচনের ফলের সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক আস্থার প্রশ্ন জড়িত। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অর্থনীতিতে ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে; ব্যর্থতা উল্টো প্রভাব ফেলবে।

দিকব্যাখ্যা
সময়গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রথম নির্বাচন
প্রেক্ষাপটঅন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে
প্রত্যাশাবৈধতা ও অংশগ্রহণ
ঝুঁকিআস্থার ঘাটতি
সুযোগরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস

বাংলাদেশের সামনে সম্ভাব্য তিনটি পথ

পথ এক: স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রূপান্তর

যদি নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে নতুন সরকার সংস্কার ও উন্নয়নের সমন্বয় ঘটাতে পারবে।

পথ দুই: সীমিত স্থিতিশীলতা

নির্বাচন হলেও রাজনৈতিক বিভাজন রয়ে যেতে পারে, যার ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ধীর হবে।

পথ তিন: নতুন অনিশ্চয়তা

কম অংশগ্রহণ বা বিতর্কিত ফলাফল ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।

সম্ভাব্য পথব্যাখ্যা
স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রূপান্তরগ্রহণযোগ্য নির্বাচন, নতুন আস্থা
সীমিত স্থিতিশীলতাসরকার গঠন হলেও বিভাজন
রাজনৈতিক অস্থিরতাকম অংশগ্রহণ বা বিতর্কিত ফল

উপসংহার: আগামীকাল শুধু ভোট নয়

আজ ১১ ফেব্রুয়ারি। আগামীকাল বাংলাদেশ ভোট দেবে।
এই ভোট কোনো একক দল বা ব্যক্তির জন্য নয়—এটি একটি প্রশ্নের উত্তর:

বাংলাদেশ কি উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের মধ্যে একটি নতুন ভারসাম্য খুঁজে পাবে?

আওয়ামী লীগের শাসন উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রশ্ন রেখে গেছে।
ইউনুস সরকার সেই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে জাতিকে।

আগামীকাল জনগণ যে রায় দেবে, তা শুধু সংসদের আসন বণ্টন করবে না—
তা ঠিক করবে, বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *