বাংলাদেশ ব্যাংকে
অভূতপূর্ব অস্থিরতা —
ব্যাংকিং খাতের
গভীর সংকট
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে রেকর্ড খেলাপি ঋণ পর্যন্ত — বৈশ্বিক মানদণ্ডের আলোকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সম্পূর্ণ চিত্র।
IMF সীমা: মাত্র ৫%
বেসেল-৩ ন্যূনতম: ১০%
বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। আজ বাংলাদেশ ব্যাংকে এমন একটি ঘটনা ঘটেছে যা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে আগে কখনও দেখা যায়নি। এই ঘটনা শুধু একটি অফিসিয়াল বিরোধের গল্প নয় — এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের গভীরে থাকা ক্ষতের এক প্রকাশ্য প্রতিফলন।
বাংলাদেশ ব্যাংকে কী হলো আজ?
আজ দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সংবাদ সম্মেলন শেষে অফিস ত্যাগ করলে, তাঁর বিশেষ উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে ব্যাংকের কর্মকর্তারা কার্যত ঘেরাও করে ফেলেন। বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স কাউন্সিলের নেতারা তাঁকে অফিস থেকে বের হয়ে যেতে বলেন এবং পুরো দৃশ্যটি ক্যামেরায় ধারণ হয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
আহসান উল্লাহ গত জানুয়ারিতে এক বছরের চুক্তিতে গভর্নরের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান। কর্মকর্তাদের মূল অভিযোগ ছিল — তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করছেন।
এই ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে: যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গোটা দেশের ব্যাংকিং খাতকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই প্রতিষ্ঠানের নিজের শৃঙ্খলা ও স্বায়ত্তশাসন কতটুকু বহাল আছে? গভর্নর মনসুর ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২ সংশোধন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধে তা এখনও আটকে আছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত না করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হতে পারবে না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরেও এই কাঠামোগত সমস্যা অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
তিন ভাগের এক ভাগ ঋণই ‘অনুপার্জিত’
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর ক্ষত হলো Non-Performing Loan বা খেলাপি ঋণ। এটি এমন ঋণ যা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করা হয়নি। সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ এই হার দাঁড়িয়েছে ৩৫.৭৩% — অর্থাৎ ব্যাংকে বিতরণ করা প্রতি তিনটি টাকার একটিই ফেরত আসার নিশ্চয়তা নেই।
২০২৩ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সরকারি তথ্যে NPL হার মাত্র ১১% দেখানো হচ্ছিল। সংস্কার সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রকৃত হিসাব বেরিয়ে আসে — আসলে তথ্য গোপন রাখার এক সুদীর্ঘ ইতিহাস ছিল।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো মোট ব্যাংকিং সম্পদের ৩০%-এর কম ধারণ করে, অথচ মোট সমস্যাগ্রস্ত ঋণের ৪৫%-এরও বেশি তাদের দখলে।
— বাংলাদেশ ব্যাংক তথ্য ও বিশ্বব্যাংক বিশ্লেষণ, ২০২৫বেসেল-৩ লঙ্ঘন: ব্যাংকগুলো কতটা দুর্বল?
মূলধন পর্যাপ্ততা বা CRAR হলো একটি ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক। বাংলাদেশে ২০২৩ সালে এটি ছিল ১০.৬৪%। মাত্র দেড় বছরের মধ্যে ২০২৪ শেষে তা নেমে এসেছে ৩.০৮%-এ।
(বাংলাদেশ, ২০২৪ শেষে)
(আন্তর্জাতিক মান)
(তুলনামূলক)
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো
বেশ কিছু বৃহৎ ব্যাংক এখন মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। নিচে প্রধান কিছু ব্যাংকের আনুমানিক মূলধন ঘাটতির চিত্র:
| ব্যাংকের নাম | মূলধন ঘাটতি | ধরন |
|---|---|---|
| জনতা ব্যাংক | ৫২,৮৯০ কোটি টাকা | রাষ্ট্রায়ত্ত |
| বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক | ১৮,১৮৮ কোটি টাকা | বিশেষায়িত |
| ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক | ১৩,৯৯১ কোটি টাকা | বেসরকারি |
| সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক | ১১,৭০৮ কোটি টাকা | বেসরকারি |
| ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ | ১২,৮৮৫ কোটি টাকা | বেসরকারি |
বিশ্বমানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থান
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অবস্থান নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
| সূচক | বাংলাদেশ | IMF/বেসেল মান | ভারত | অবস্থান |
|---|---|---|---|---|
| NPL হার | ৩৫.৭৩% | ৫% এর নিচে | ~৩.৫% | ❌ অত্যন্ত খারাপ |
| মূলধন পর্যাপ্ততা (CRAR) | ৩.০৮% | ন্যূনতম ১০% | ১৬.৫% | ❌ মানদণ্ডের অনেক নিচে |
| মুদ্রাস্ফীতি (নভেম্বর ২০২৫) | ৮.২৯% | ২–৪% | ৫.৫% | ⚠️ উচ্চ |
| জিডিপি প্রবৃদ্ধি (FY২০২৫) | ৩.৯৭% | লক্ষ্য ৭%+ | ~৬.৫% | ⚠️ লক্ষ্যমাত্রার নিচে |
| কর-জিডিপি অনুপাত | ৬.৮% | বৈশ্বিক গড় ১৫-২০% | ১০.৯% | ❌ অত্যন্ত কম |
| বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ | $৩২.৫৭B | ৩ মাসের আমদানি | $৬২৬B+ | ⚠️ ক্রমশ উন্নতি |
| রেমিট্যান্স (FY২৪-২৫) | $৩০.০৪B (রেকর্ড) | — | — | ✅ শক্তিশালী |
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট
দক্ষিণ এশিয়ায় গড় NPL হার প্রায় ৭.৯%। এই অঞ্চলে বাংলাদেশের NPL সবচেয়ে বেশি। ইন্দোনেশিয়া ২০১৮-২২ সময়কালে ৬ কোটি নতুন গ্রাহককে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে যুক্ত করেছে। কেনিয়ায় M-Pesa-র মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রবাহ ২৪% বেড়েছে। বিপরীতে, বাংলাদেশে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর হার ৬৭% হলেও মাত্র ১২% ব্যাংকিং লেনদেন ডিজিটালে সম্পন্ন হয়।
কী হচ্ছে, কতটুকু এগোচ্ছে?
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবেলায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে:
- ◆ ১৪টি দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ প্রতিস্থাপন; একটিতে প্রশাসক নিয়োগ
- ◆ IMF, বিশ্বব্যাংক ও ADB সহায়তায় ১৮টি বেসরকারি ব্যাংকের Asset Quality Review (AQR) চলমান
- ◆ ব্যাংক রেজোলিউশন অধ্যাদেশ (মে ২০২৫) এবং আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি
- ◆ আমানত বিমার সীমা ১ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ টাকায় উন্নীত
- ◆ ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি মডেল চালু; জানুয়ারি ২০২৬ থেকে প্রতিটি ব্যাংকে একক তদারকি দল
পুরনো ক্ষমতা কাঠামো, আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ এবং আসন্ন নির্বাচনী রাজনীতির কারণে সংস্কার প্রক্রিয়া মন্থর। আজকের বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনাই প্রমাণ করে — প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শুধু কাগজে লিখলে হয় না, বাস্তবে প্রয়োগ করতে হয়।
অন্ধকারের মধ্যে কিছু ইতিবাচক চিত্র
২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসী আয় রেকর্ড ৩০.০৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে — বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ। হুন্ডি দমনে কঠোর পদক্ষেপ এই রেকর্ডে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ডিসেম্বর ২০২৫-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ৩২.৫৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে — এক বছর আগে যা ছিল ২৪.৯৪ বিলিয়ন।
বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের জন্য আবেদন গ্রহণ করছে। টেলিকম অপারেটর ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো উৎসাহী। এটি দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে পারে।
সামনের পথ: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন সতর্ক করেছে — সমাধান না হলে ব্যাংকিং সংকট বাংলাদেশের বার্ষিক GDP প্রবৃদ্ধি ১.৫% পর্যন্ত হ্রাস করতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ-মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্ন আরও দূরে সরে যাবে।
বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) মর্যাদা থেকে উত্তরণ করবে। এরপর রপ্তানিতে যে শুল্ক-সুবিধা পাওয়া যেত তা কমে যাবে, আর ব্যাংকিং খাত দুর্বল থাকলে বিনিয়োগ টানাও কঠিন হবে।
টেকসই পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত পেশাদার পর্ষদ, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির (AMC) মাধ্যমে খেলাপি ঋণ পরিষ্কার, এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা।
— IMF ও বিশ্বব্যাংকের সম্মিলিত সুপারিশতবে শেষ কথা হলো — বাংলাদেশ আগেও অনেক বড় সংকট অতিক্রম করেছে। ১৯৭২ সালে শূন্য থেকে শুরু করে আজ ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। সুশাসন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এই খাতের পুনরুদ্ধার সম্ভব — এবং সেই সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি।