শহীদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই
আল্লাহর রাহে শাহাদাত বরণ করেছেন
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে ইসরায়েলি বায়ুসেনা তেহরানে তাঁর কার্যালয়ে ৩০টি বোমা নিক্ষেপ করে। সকাল ৮টা ১০ মিনিটে এই নৃশংস হামলায় তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
আল্লাহ তা’আলা বলেছেন — وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا ۚ بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ — “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদের মৃত মনে করো না — বরং তারা জীবিত, তাদের রবের কাছে রিজিক পাচ্ছে।” (সূরা আল-ইমরান: ১৬৯)
এক সংগ্রামী জীবনের সূচনা
সাইয়্যেদ আলী হোসেইনি খামেনেই ১৯৩৯ সালের ১৭ই জুলাই ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে এক আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই কুরআনের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। মাশহাদের মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষার পর নাজাফ ও কোমে উচ্চতর ইলম অর্জন করেন। কোমে অধ্যয়নকালে তিনি ইমাম খোমেইনীর চিন্তায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন।
শাহ রেজা পাহলভীর স্বৈরাচারী শাসনামলে তিনি জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। ১৯৬৩ সাল থেকে বহুবার কারাবন্দী হন, নির্যাতন সহ্য করেন, নির্বাসিত হন — কিন্তু সত্যের পথ থেকে সরে আসেননি। কারাগারে বসেও কুরআন তেলাওয়াত করতেন এবং প্রতিটি কষ্টকে আল্লাহর পরীক্ষা মনে করে সবর করতেন।
এই আয়াতকে খামেনেই তাঁর সমগ্র জীবনের পথপ্রদর্শক মনে করতেন। ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর তিনি তেহরানের জুমার ইমাম হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি হন, একটি ভয়াবহ বোমা হামলায় ডান হাত স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দায়িত্ব থেকে সরে আসেননি। ১৯৮৯ সালে ইমাম খোমেইনীর ইন্তেকালের পর সর্বোচ্চ নেতার আসনে অধিষ্ঠিত হন এবং শাহাদাত পর্যন্ত সেই আসনে থেকেছেন।
মাশহাদে আলেম পরিবারে জন্ম। শৈশব থেকে কুরআন ও ইসলামী ইলমের প্রতি গভীর অনুরাগ।
নাজাফ ও কোমে উচ্চতর ইসলামী ইলম। ইমাম খোমেইনীর চিন্তায় অনুপ্রাণিত। ফিকহ ও দর্শনে গভীর পারদর্শিতা।
শাহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। একাধিকবার কারাবরণ ও নির্বাসন। নির্যাতন সহ্য করেও ঈমানের পথে অবিচল।
ইসলামী বিপ্লবের মহাবিজয়। শাহের পতন। তেহরানের জুমার ইমাম। কুরআনের আলোয় জাতিকে পথ দেখানো শুরু।
দু’বার রাষ্ট্রপতি। বোমা হামলায় ডান হাত ক্ষতিগ্রস্ত। তবু সংগ্রাম থামেনি। ইরাক-ইরান যুদ্ধে নেতৃত্ব।
সর্বোচ্চ নেতার ৩৭ বছর। ফিলিস্তিন, লেবানন, ইয়েমেনের পাশে। মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অটল।
২০২৬
শাহাদাত — মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় তেহরানে শহীদ। إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
যুলুমের বিরুদ্ধে কুরআন ও সহীহ হাদিসের দলিল
আয়াতুল্লাহ খামেনেইয়ের সমগ্র জীবন বোঝার জন্য কুরআনে যুলুম (জুলুম) সম্পর্কে আল্লাহর অবস্থান বুঝতে হবে। ইসলামে জুলুম কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয় — এটি আল্লাহর বিধানের সরাসরি লঙ্ঘন। আলেমগণ সবসময় এই সত্যকে মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন।
এই আয়াত শুধু ব্যক্তিগত অন্যায়ের বিষয়ে নয় — যে রাষ্ট্র, যে সাম্রাজ্য, যে শক্তি মানুষকে নিপীড়ন করে, তাদের বিরুদ্ধেও এই আয়াত সমান প্রযোজ্য। খামেনেই এই সত্যকে তাঁর সমগ্র কর্মজীবনের মূল দর্শন বানিয়েছিলেন।
এই হাদিসে কুদসি প্রমাণ করে যে যুলুম সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিষিদ্ধ — আল্লাহ নিজেই এটি নিজের উপর হারাম করেছেন। খামেনেই এই হাদিসকে তাঁর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু বলে বারবার উল্লেখ করেছিলেন।
এই হাদিস খামেনেই বারবার উল্লেখ করতেন। গাজার শিশু, ফিলিস্তিনের মা, ইয়েমেনের অভুক্ত মানুষের দোয়া আল্লাহ শুনছেন — এই দৃঢ় বিশ্বাস তাঁকে সারাজীবন মাজলুমদের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেছে।
এই আয়াত প্রতিরোধকে বৈধতা দেয়। খামেনেই বলতেন: ফিলিস্তিনি, লেবানীয় বা ইয়েমেনি যে প্রতিরোধ করছে সে নিজেকে রক্ষা করছে — এবং এটি আল্লাহর আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যুলুমের বিরুদ্ধে তাঁর ঐতিহাসিক অবস্থান
মালহামাতুল কুবরা
মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৃথিবী
(শুধুমাত্র সহীহ ও হাসান হাদিসের আলোকে)
মালহামা কী?
আল-মালহামাতুল কুবরা (الملحمة الكبرى) — এর আক্ষরিক অর্থ “সর্বমহান যুদ্ধ।” ইসলামী আকায়েদে এটি হলো কিয়ামতের আগের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। এটি সম্পর্কে নবী মুহাম্মাদ (সা.) বেশ কয়েকটি হাদিসে বিস্তারিত বলেছেন।
মালহামার সূচনার পটভূমি — সহীহ হাদিস
এই সহীহ হাদিসে “রোমান” দ্বারা পশ্চিমা শক্তিকে বোঝানো হয়েছে বলে আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন। হাদিসটি বলছে একটি ক্রুশ ভাঙার ঘটনা থেকে বৃহত্তর যুদ্ধের সূচনা হবে।
এই সহীহ হাদিস আজকের মুসলিম বিশ্বের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মুসলমানরা সংখ্যায় দেড় বিলিয়নেরও বেশি — কিন্তু ঐক্যের অভাব ও দুনিয়ার মোহ তাদের দুর্বল করে রেখেছে।
মালহামার পরবর্তী ঘটনাক্রম — সহীহ ও হাসান হাদিস অনুযায়ী
১. কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) বিজয়
মালহামার পর মুসলমানরা কনস্টান্টিনোপল জয় করবেন। হাদিসে আছে এই বিজয় হবে “তাকবীর” ও “তাহলীল” এর মাধ্যমে, অস্ত্রের মাধ্যমে নয়। (সুনান আবু দাউদ ৪২৯৪ — হাসান)
২. হযরত ঈসা (আ.)-এর অবতরণ ও দাজ্জাল বধ
সহীহ হাদিসে আছে: হযরত ঈসা (আ.) দামেস্কের পূর্বের শ্বেত মিনারায় অবতরণ করবেন এবং লুদ্দের দরজায় দাজ্জালকে বধ করবেন। (সুনান আবু দাউদ ৪৩২১ — সহীহ)
৩. ইউফ্রেটিস নদীর স্বর্ণ প্রকাশ
ফোরাত নদী শীঘ্রই স্বর্ণের ভাণ্ডার উন্মোচন করবে। নবীজি সতর্ক করেছেন: যে সেখানে থাকবে সে যেন এক কণাও না নেয়। (সুনান আবু দাউদ ৪৩১৩ — সহীহ)
আল্লাহই ভালো জানেন গায়বের বিষয়। তবে বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ সমকালীন আলেমদের গভীরভাবে ভাবাচ্ছে।
বর্তমান ঘটনা ও সহীহ হাদিসের মিল
চিহ্ন ১: মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক রক্তপাত ও দুর্বলতা (“ওয়াহান”)
সহীহ হাদিস (আবু দাউদ ৪২৯৭)-এ বর্ণিত “ওয়াহান” — দুনিয়াপ্রীতি ও মৃত্যুভয় — আজকের মুসলিম বিশ্বে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। গাজায় ৫০,০০০+ শহীদ, ইয়েমেনে লক্ষাধিক মৃত্যু — অথচ মুসলিম রাষ্ট্রগুলো নিষ্ক্রিয়।
চিহ্ন ২: বায়তুল মাকদিস কেন্দ্রীয় সংঘাতের কেন্দ্র
হাদিসে (আবু দাউদ ৪২৯৪ — হাসান) বায়তুল মাকদিস ও মদিনার উল্লেখ আছে। বর্তমানে আল-কুদস ও মসজিদুল আকসার উপর ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা ক্রমশ বাড়ছে।
চিহ্ন ৩: পশ্চিমা জোটের বিশাল সামরিক সমাবেশ
সহীহ হাদিস (আবু দাউদ ৪২৯২)-এ বলা হয়েছে যে একটি ঘটনার পর পশ্চিমা শক্তি “মালহামার জন্য সমাবেশ ঘটাবে।” বর্তমানে ন্যাটো ও তার মিত্রদের মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি এই বর্ণনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
চিহ্ন ৪: সিরিয়া ও দামেস্কের গুরুত্ব
সহীহ হাদিস (আবু দাউদ ৪২৯৮)-এ দামেস্কের গুতা অঞ্চলকে মালহামায় মুসলমানদের ঘাঁটি বলা হয়েছে। বর্তমানে সিরিয়া বিভিন্ন বিদেশী শক্তির রণক্ষেত্রে পরিণত।
চিহ্ন ৫: খামেনেইয়ের শাহাদাত — একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত
মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান প্রতিরোধের কণ্ঠস্বরকে সরাসরি হত্যা করা হয়েছে। এই শাহাদাত পরিস্থিতিকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। আলেমরা লক্ষ্য করছেন — ঘটনাগুলো একটি নির্দিষ্ট দিকে যাচ্ছে।
ইসলামে শহীদের অবদান ও উত্তরাধিকার
শহীদ কি মৃত?
আল্লাহ বলেছেন: “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদের মৃত ভেবো না — বরং তারা জীবিত, তাদের রবের কাছে রিজিক পাচ্ছে।” (আল-ইমরান: ১৬৯)। শহীদের রক্ত কখনো বৃথা যায় না।
জালেমের পরিণতি
নবীজি (সা.) বলেছেন (সহীহ মুসলিম ২৫৭৮): “যুলুম থেকে বেঁচে থাকো — কিয়ামতের দিন যুলুম অন্ধকার হয়ে আসবে।” যারা এই হত্যা করেছে তাদের জন্য আল্লাহর বিচার নিশ্চিত।
উম্মাহর করণীয়
সহীহ হাদিস (আবু দাউদ ৪২৯৭)-এ সতর্কতা: “ওয়াহান” (দুনিয়াপ্রীতি) থেকে মুক্ত হও, ঐক্যবদ্ধ হও এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখো।
শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনেই চলে গেছেন — কিন্তু তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে যে সত্য তিনি ধারণ করেছিলেন, সেই সত্য অমর।
আল্লাহ তা’আলা তাঁকে শহীদদের সর্বোচ্চ মর্যাদায় ভূষিত করুন, জান্নাতুল ফিরদাউসে স্থান দিন এবং মুসলিম উম্মাহকে এই কঠিন সময়ে হেদায়েত, ঐক্য ও সবর দান করুন।