ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং
বাংলাদেশের উপর এর
বর্তমান ও সম্ভাব্য প্রভাব
হরমুজ প্রণালী থেকে ৪,০০০ কিলোমিটার দূরে থেকেও বাংলাদেশ এই যুদ্ধের কম্পন অনুভব করছে — জ্বালানি, রেমিট্যান্স, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা — সর্বত্র।
সংঘাতের পটভূমি: কীভাবে শুরু হলো এই যুদ্ধ?
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। মাত্র ১২ ঘণ্টায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, বিমান প্রতিরক্ষা অবকাঠামো, সামরিক স্থাপনা এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে প্রায় ৯০০টি হামলা পরিচালিত হয়।
এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই নিহত হন এবং কয়েক ডজন শীর্ষ কর্মকর্তা প্রাণ হারান। ইরান পাল্টা হামলা শুরু করে ইসরায়েল, মার্কিন ঘাঁটি এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন-মিত্র দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে। একই সঙ্গে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় — যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস সরবরাহ পথ।
“বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট।”
— আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA)-র প্রধানআন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা এই সংঘাতকে ১৯৭০-এর দশকের জ্বালানি সংকটের পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিঘ্নকারী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) সরবরাহ হয়।
অর্থনৈতিক প্রভাব: ভূমিকম্পের মতো ধাক্কা
বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এই প্রভাবকে “ঝড়ের মতো নয়, ভূমিকম্পের মতো” বলে অভিহিত করেছেন। ঝড় চলে যায়, কিন্তু ভূমিকম্প কাঠামো ভেঙে দেয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির তিনটি মূল স্তম্ভ — জ্বালানি আমদানি, রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি বাণিজ্য — সবই এই সংকটে আক্রান্ত।
📊 বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব (SANEM বিশ্লেষণ)
- তেলের দাম প্রতি $১০ বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় $৯০০ মিলিয়ন বাড়ে
- বর্তমানে তেলের দাম $৭২ থেকে বেড়ে $১২১ হয়েছে — বাড়তি চাপ প্রায় $৪৪০০ কোটি
- যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১.২ থেকে ৩ শতাংশ কমতে পারে
- রেমিট্যান্স ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমার আশঙ্কা; গত বছর ছিল ২২ বিলিয়ন ডলার
- বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে
- মুদ্রাস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী — ফেব্রুয়ারিতে ১০ মাসের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান বলেছেন এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য “উটের পিঠ ভাঙা শেষ খড়ের বোঝা” হতে পারে। নোবেলজয়ী জোসেফ স্টিগলিৎজ স্থবির মূল্যস্ফীতি (stagflation)-এর আশঙ্কা করছেন। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই সংকট আরও গভীর।
“প্রতি $১০ তেলের দাম বৃদ্ধি মানে বাংলাদেশের আমদানি বিলে $৯০০ মিলিয়নের বাড়তি চাপ। এখন পার্থক্য $৪৯ — মানে প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বোঝা।”
— ড. জাহিদ হোসেন, সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, বিশ্ব ব্যাংক ঢাকাশিল্প ও জ্বালানি: পোশাক খাতে বিপর্যয়ের আশঙ্কা
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক (RMG) খাত থেকে। এই খাত এখন একটি “দ্বৈত আঘাত” সামলাচ্ছে — এক দিকে চাহিদা কমছে, অন্য দিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে।
⚠ পোশাক খাতে তাৎক্ষণিক সংকট
ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রপ্তানি জানুয়ারি ২০২৬-এ আগের বছরের তুলনায় ২৫.২৫ শতাংশ কমেছে। নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিন্থেটিক সুতা ও রাসায়নিকের দাম ১০-১৫ শতাংশ বেড়েছে এবং কিছু কাঁচামালের দাম তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
BGMEA-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, ইরান যুদ্ধ পোশাক খাতের লজিস্টিক্স ও জ্বালানি খরচ উভয়কে অস্থিতিশীল করে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বড় শিপিং লাইনগুলো ভারত উপমহাদেশ থেকে উপসাগরীয় গন্তব্যে কার্গো বুকিং স্থগিত করেছে।
🏭 শিল্প খাতে প্রভাবের চিত্র
- পোশাক কারখানায় বিদ্যুৎ ও জেনারেটর খরচ উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে
- কেপ অফ গুড হোপ হয়ে পণ্য পরিবহনে ১০-১৪ দিন বাড়তি সময় লাগছে
- পণ্য পরিবহন বিমা প্রিমিয়াম তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে
- বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন যানবাহনভেদে জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে
- চীন ও ভারত থেকে বিকল্প ডিজেল আমদানি শুরু হয়েছে
- কিছু কারখানা ডিজেল সংকটে উৎপাদন বাধার ঝুঁকিতে রয়েছে
- সার শিল্পে কাঁচামালের সংকট; কৃষিতে বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ইরানের আকাশসীমা এড়িয়ে সৌদি আরব ও কুয়েতে বিকল্প রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে, যাতে ১০-১৫ মিনিট বাড়তি সময় এবং বাড়তি জ্বালানি খরচ যুক্ত হচ্ছে। কার্গো ও পণ্য পরিবহনে বিঘ্নের ফলে সময়মতো ডেলিভারির ক্ষমতা হুমকিতে পড়েছে।
প্রবাসী শ্রমিক ও রেমিট্যান্স: ৮৬ লাখ পরিবারের সংকট
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের ৮৬ লাখেরও বেশি শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ওমান ও জর্ডানে নির্মাণ ও সেবা খাতে তারা কাজ করেন। ইরান যুদ্ধ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়া অস্থিতিশীলতায় তাদের কর্মসংস্থান এখন ঝুঁকিতে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির সতর্ক করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণ ও সেবা খাত ধীর হয়ে পড়লে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ছাঁটাই শুরু হবে। শুধু ১০ শতাংশ শ্রমিক ফিরে এলেও দেশে বেকারত্বের যে ধাক্কা তৈরি হবে, তা সামলানো কঠিন হবে।
💸 রেমিট্যান্স ও শ্রমিক সংকটের চিত্র
- গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে $২২ বিলিয়ন — ২০% হ্রাস পেলে ক্ষতি $৪.৪ বিলিয়ন
- উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক চাপে বিদেশি শ্রমিক ছাঁটাই করতে পারে
- কাতার এনার্জি LNG চুক্তিতে Force Majeure ঘোষণা করেছে — উপসাগরীয় অর্থনীতিতে গভীর ক্ষত
- ইরান ও ইরাকে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন
- নতুন শ্রমিক প্রেরণ প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে
- গ্রামীণ অর্থনীতি, যা রেমিট্যান্সের উপর নির্ভরশীল, চাপে পড়বে
বাংলাদেশ সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক ডেকেছে এবং তেহরানে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে সমন্বয় রাখছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ূন কবীর বলেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: সারের দাম ও মূল্যস্ফীতির চাপ
যুদ্ধের প্রভাব শুধু শহুরে শিল্পে সীমাবদ্ধ নয় — গ্রামের কৃষক পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় কাতার ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা সার (ইউরিয়া, ডিএপি) সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশ্ব বাজারে সারের দাম দ্রুত বাড়ছে।
⚠ কৃষিতে হুমকির চিত্র
জ্বালানির দাম বাড়লে সেচ পাম্পের খরচ বাড়ে, যানবাহন খরচ বাড়ে, উৎপাদিত পণ্য বাজারে পৌঁছানো কঠিন হয়। সার সংকট মৌসুমি ফসলের উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। মূল্যস্ফীতি মার্চ ২০২৩ থেকে ৯ শতাংশের উপরে রয়েছে এবং ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ আবার ১০ মাসের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে।
খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি নিম্ন আয়ের পরিবারকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। পোশাক শ্রমিক, রিকশাচালক, দিনমজুর — এই মানুষগুলোর ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমছে। জ্বালানি থেকে কৃষি সেচ, পরিবহন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন — সব কিছুতেই খরচ বাড়ছে এবং তা খাদ্যের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাত: ওষুধ, হাসপাতাল ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকট
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত এই যুদ্ধের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল, হাসপাতালের জেনারেটর জ্বালানি, এবং মানসিক স্বাস্থ্য — সর্বত্র এই সংকটের ছায়া পড়ছে।
🏥 স্বাস্থ্য খাতে প্রভাবের বিস্তার
- ওষুধ শিল্প: সক্রিয় ওষুধ উপাদান (API) ও পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামালের দাম বেড়েছে; এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি বিঘ্নিত হচ্ছে
- হাসপাতাল পরিচালনা: বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জেনারেটর জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে হাসপাতালের পরিচালনা ব্যয় বাড়ছে
- চিকিৎসা সরঞ্জাম: মধ্যপ্রাচ্য হয়ে আসা চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের আমদানিতে দেরি হচ্ছে
- দরিদ্র রোগী: মূল্যস্ফীতিতে গরিব পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর ক্ষমতা কমছে
- মানসিক স্বাস্থ্য: প্রবাসী শ্রমিকদের পরিবারে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে; যুদ্ধের খবরে মানুষের মানসিক চাপ বৃদ্ধি
- স্বাস্থ্যসেবার অ্যাক্সেস: পরিবহন খরচ বাড়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের হাসপাতালে আসতে অসুবিধা হচ্ছে
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা মানসিক চাপে রয়েছেন। যুদ্ধের শব্দ, বিস্ফোরণ, দূতাবাস বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা — এই সব কিছু তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলছে। পরিবার থেকে দূরে থাকা এই মানুষগুলো উভয় সংকটে — আর্থিক ও মানসিক।
শিক্ষা খাত: বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ও শিক্ষার ক্ষতি
জ্বালানি সংকট সরাসরি শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে। সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য আসন্ন ঈদুল ফিতরের ছুটি আগাম ঘোষণা করে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছে। শপিং মল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
📚 শিক্ষা খাতে প্রভাব
- জ্বালানি সাশ্রয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগাম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে
- বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনলাইন ক্লাস কার্যকরভাবে পরিচালনা কঠিন হচ্ছে
- শিক্ষার্থীদের ট্রান্সপোর্ট খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারের শিক্ষা বাজেটে চাপ
- বিদেশে উচ্চশিক্ষাগ্রহণে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের আবেদন ফি ও ভিসা খরচ বেড়েছে (ডলারের দাম বৃদ্ধি)
- মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত অভিভাবকদের সন্তানদের শিক্ষা খরচে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে
- গবেষণা ও বিজ্ঞান শিক্ষার কাঁচামাল (ল্যাবরেটরি সরঞ্জাম) আমদানিতে বিঘ্ন
দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট শিক্ষার মান ও অ্যাক্সেস উভয়কে প্রভাবিত করতে পারে। রেমিট্যান্স আয় কমলে গ্রামীণ পরিবারের সন্তানের শিক্ষা ব্যয় মেটানো কঠিন হবে। বিশেষত মেয়েশিশুদের শিক্ষা, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসী বাবার আয়ের উপর নির্ভরশীল, ঝুঁকিতে পড়বে।
অন্যান্য খাত: পরিবহন, ব্যাংকিং ও সামাজিক প্রভাব
🌐 বিভিন্ন খাতে প্রভাব
- পরিবহন: ডিজেলের দাম বাড়ায় বাস-ট্রাক ভাড়া বেড়েছে; দীর্ঘ লাইন জ্বালানি স্টেশনে; সরকার সেনা মোতায়েন করে মজুদদারি ঠেকাচ্ছে
- ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ: ডলারের বিপরীতে টাকার আরও অবমূল্যায়নের আশঙ্কা; বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে চাপ; বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ধাক্কা
- বিমান চলাচল: মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশ আকাশসীমা বন্ধ করেছে; এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজসহ বড় এয়ারলাইন্স ফ্লাইট স্থগিত; বিমান বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত
- পর্যটন: মধ্যপ্রাচ্যগামী বাংলাদেশি পর্যটন ও ওমরাহ ফ্লাইট ব্যাহত; উমরাহ পালনকারীরা আটকা পড়েছেন
- তথ্যপ্রযুক্তি: ব্যান্ডউইথ ও ডেটা সেন্টার পরিচালনায় বিদ্যুৎ খরচ বৃদ্ধি; ফ্রিল্যান্সারদের আয় ডলারে হলেও তেল-মূল্যস্ফীতির পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে
- সামাজিক প্রভাব: নিম্নবিত্ত পরিবারে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি; খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বাড়ছে
সরকারের সাড়া: তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল
বাংলাদেশ সরকার সংকটের তীব্রতা অনুধাবন করে দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক, জ্বালানি রেশনিং, বিকল্প সরবরাহকারীর সন্ধান এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ — এই সব কিছু একযোগে চলছে।
🏛 সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ
- চীন ও ভারত থেকে বিকল্প ডিজেল আমদানির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে
- কিছু তেল উৎপাদনকারী দেশের সঙ্গে বিলম্বিত মূল্য পরিশোধের চুক্তি করা হয়েছে
- বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে শপিং মল রাত ৮টায় বন্ধ, বিজ্ঞাপনী আলোকসজ্জা বন্ধ রাখার নির্দেশ
- জ্বালানি স্টেশনে সেনা মোতায়েন করে মজুদদারি রোধ
- বিশ্ববিদ্যালয় আগাম ছুটি ঘোষণা করে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো
- প্রবাসীদের নিরাপত্তায় উপসাগরীয় দূতাবাসগুলোর সঙ্গে জরুরি যোগাযোগ বজায়
- মার্চ ২০২৬-এ স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকায় জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত রাখা
“দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হলো — জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো।”
— SANEM ও ঢাকা টাইমস২৪ বিশ্লেষণ, এপ্রিল ২০২৬ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি: বাংলাদেশের করণীয়
SANEM-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেছেন, এই একাধিক ধাক্কা একসঙ্গে আসায় বাংলাদেশ স্বল্পমেয়াদে মাঝারি থেকে তীব্র অর্থনৈতিক চাপে পড়বে। দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে একই রকম সংকট আরও বিপজ্জনক হবে।
🔭 বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ
- জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যময় করা — একটি পথে নির্ভরশীলতা কমানো জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন
- দেশীয় গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জরুরি বিনিয়োগ বাড়ানো
- রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্য আনা — ইউরোপ-আমেরিকার পাশাপাশি এশিয়া ও আফ্রিকায় বাজার খোঁজা
- প্রবাসী শ্রমিক পাঠানোর গন্তব্য বিস্তার করা — শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপে
- দরিদ্র পরিবারকে সুরক্ষায় লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা প্রদান
- পণ্য পরিবহনে বন্দর সুবিধা ও খরচ কমিয়ে পোশাক খাতকে সহায়তা
- কূটনৈতিক তৎপরতা — যুদ্ধবিরতির পক্ষে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সোচ্চার হওয়া
বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে এই যুদ্ধে শান্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কোনো সামরিক অ্যাজেন্ডা নেই — কিন্তু লাখো মানুষের জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষায় সতর্ক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।
“বাংলাদেশের উন্নয়নের মডেল রপ্তানিনির্ভর শিল্প ও প্রবাসী আয়ের উপর দাঁড়িয়ে। এই মডেলের দুর্বলতা এখন স্পষ্ট — বৈচিত্র্য আনতে না পারলে প্রতিটি ভূরাজনৈতিক সংকটে আমরা একই ধাক্কা খাব।”
— অধ্যাপক সেলিম রায়হান, নির্বাহী পরিচালক, SANEMতথ্যসূত্র: The Daily Star, Al Jazeera, Britannica, SANEM Policy Analysis, Nikkei Asia, TIME Magazine, Wikipedia (Economic Impact of the 2026 Iran War), Dhaka Times24, Pressenza, Anadolu Agency এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন। সকল তথ্য ৭ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত আপডেট করা হয়েছে।